

কখনও প্রচণ্ড রোদ, কখনও ঝুম বৃষ্টি। মাথার ওপরে খোলা আকাশ, পাশে নেই খাবার কিংবা বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা। সীমান্তের শূন্যরেখায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন ৯ জন মানুষ—তিনজন পুরুষ, তিনজন নারী ও তিনটি শিশু। একদিকে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) তাদের বাংলাদেশি বলে দাবি করছে, অন্যদিকে বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি) বলছে, যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়া কাউকে গ্রহণ করা হবে না। এই দ্বন্দ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অসহায় হয়ে পড়েছে মানুষগুলো, যাদের মৌলিক মানবাধিকার ও নিরাপত্তা অনিশ্চয়তার মুখে।
বুধবার (২৪ জুন) ভোরে নওগাঁর সাপাহার উপজেলার আদাতলা সীমান্তের ২৪৪/এমপি পিলার এলাকা দিয়ে ৯ জনকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করে বিএসএফ। তবে বিজিবি ও স্থানীয় জনগণের সতর্ক অবস্থানের কারণে তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারেননি। বিকেল পর্যন্ত প্রায় ১৩ ঘণ্টা তারা শূন্যরেখায় অবস্থান করেন। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের কাছে খাবার বা পানীয় কিছুই ছিল না। বিশেষ করে শিশুদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা ও সাবেক ইউপি সদস্য নুরুল ইসলাম বলেন, “ভোর থেকে তারা খোলা আকাশের নিচে রয়েছে। খাবার-পানি ছাড়া দীর্ঘ সময় কাটানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।”
ঘটনাটি শুধু সীমান্ত নিরাপত্তা বা অভিবাসন ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন নয়; এটি সরাসরি মানবাধিকার, নাগরিকত্ব এবং রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার বিষয়ও। একজন ব্যক্তি কোন দেশের নাগরিক—তা নির্ধারণের আগে তাকে সীমান্তে আটকে রাখা বা জোরপূর্বক ঠেলে দেওয়া মানবিক ও আইনি উভয় দিক থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ‘পুশইন’ ও ‘পুশব্যাক’ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। সংসদে দেওয়া তথ্যমতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ১৭ জুন পর্যন্ত মোট ২ হাজার ৩৬৯ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে অধিকাংশকে সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে, কিছু সংখ্যককে ফেরত দেওয়া হয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে পুশব্যাক করা হয়েছে।
মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের মতে, কাউকে অবৈধ অভিবাসী বা অন্য দেশের নাগরিক হিসেবে দাবি করলেই তাকে তাৎক্ষণিকভাবে সীমান্ত পার করে দেওয়া যায় না। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতিমালা অনুযায়ী, ফেরত পাঠানোর আগে কিছু মৌলিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা প্রয়োজন। যেমন—
এসব ধাপ অনুসরণ ছাড়া কাউকে সীমান্তে ঠেলে দেওয়া বা ফেরত পাঠানো মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল হতে পারে।
জুন মাসের শুরু থেকেই দেশের উত্তর ও পশ্চিম সীমান্তে একাধিক পুশইন চেষ্টার ঘটনা সামনে এসেছে। লালমনিরহাট, পঞ্চগড় ও চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় এ ধরনের অভিযোগ করেছে বিজিবি।
আরও পড়ু:
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে, ২০ জনকে পুশ-ইনের চেষ্টা, বিজিবির বাধায় ফেরত নিলো বিএসএফ
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ৫৭তম বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়। বাংলাদেশ পক্ষের দাবি, শুধু বাংলাদেশি নয়, রোহিঙ্গা এবং মিয়ানমারের নাগরিকদেরও বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা হয়েছে। এ ধরনের পদক্ষেপ বন্ধ করে বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় প্রটোকল অনুসরণ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, শূন্যরেখায় নারী ও শিশুদের দীর্ঘ সময় আটকে রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) মনে করে, নাগরিকত্ব যাচাইয়ের স্বচ্ছ ও আইনসম্মত প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে সীমান্তে আটকে রাখা বা জোরপূর্বক প্রবেশ করানোর চেষ্টা মানবাধিকারের পরিপন্থী।
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)-এর নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, পুশইন ও পুশব্যাকের ফলে নারী, শিশু, বয়স্ক এবং দরিদ্র সীমান্তবাসীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ে। এতে পরিবার বিচ্ছিন্নতা, মানবপাচার, সহিংসতা, খাদ্যসংকট ও চিকিৎসা বঞ্চনার মতো মানবিক সংকট সৃষ্টি হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক আইনের ‘নন-রিফাউলমেন্ট’ নীতি অনুযায়ী, কাউকে এমন স্থানে ফেরত পাঠানো যায় না যেখানে তার জীবন, স্বাধীনতা বা নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে। তাই প্রতিটি ঘটনায় স্বচ্ছ, মানবিক ও ন্যায্য যাচাই-বাছাই নিশ্চিত করা জরুরি।
সীমান্ত রক্ষা প্রতিটি রাষ্ট্রের বৈধ দায়িত্ব। তবে নিরাপত্তার প্রশ্নে মানবিকতা ও মানবাধিকারকে উপেক্ষা করা উচিত নয়। যে মানুষগুলো শূন্যরেখায় দিন কাটাচ্ছেন, তারা কোনো পরিসংখ্যান নয়; তারা রক্ত-মাংসের মানুষ। তাদের পরিচয় যাচাই হতে পারে, আইনি প্রক্রিয়া চলতে পারে, কিন্তু সেই সময়টুকুতে তাদের মৌলিক মানবিক অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রগুলোর দায়িত্ব।
সীমান্তে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক টানাপড়েন চলতেই পারে, কিন্তু মানবিক মর্যাদা যেন কখনো শূন্যরেখায় আটকে না থাকে—সেটাই হওয়া উচিত দুই দেশের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
© 2026 News Alo All Rights Reserved.