
ইসলামী বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস মহররম চারটি সম্মানিত মাসের অন্যতম। এই মাসের ১০ তারিখ, অর্থাৎ আশুরার দিন, ইসলামে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজে এ দিনে রোজা রেখেছেন এবং সাহাবিদেরও রোজা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে—১০ মহররমের বিশেষ মর্যাদার প্রকৃত কারণ কী? এদিনের ফজিলত কি শুধু কারবালার ঘটনার জন্য, নাকি এর পেছনে আরও গভীর ইতিহাস রয়েছে? কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে এর উত্তর জানা জরুরি।
মহান আল্লাহ তাআলা বলেন—
"নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে মাসের সংখ্যা বারোটি। এর মধ্যে চারটি সম্মানিত মাস।"
(সুরা আত-তাওবা: ৩৬)
এই চারটি সম্মানিত মাসের মধ্যে মহররম অন্যতম। তাই এ মাসে নেক আমলের গুরুত্ব এবং গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার গুরুত্ব আরও বেশি।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন—
"আমি আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে রমজানের রোজা ও আশুরার দিনের রোজার মতো অন্য কোনো রোজাকে এত গুরুত্ব দিতে দেখিনি।"
(সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০০৬)
এ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, আশুরার রোজা মহানবী (সা.)-এর কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নফল ইবাদত ছিল।
আশুরার রোজার বিশেষ মর্যাদা সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন—
"আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, আশুরার দিনের রোজা পূর্ববর্তী এক বছরের (সগিরা) গুনাহের কাফফারা হবে।"
(সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৬২)
এ হাদিস থেকে জানা যায়, আন্তরিকতার সঙ্গে আশুরার রোজা পালন করলে আল্লাহ তাআলা বান্দার পূর্ববর্তী এক বছরের ছোট গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দিতে পারেন।
আরও পড়ুন:
দেয়ালে মানুষের ছবি থাকলে সেই কক্ষে নামাজ আদায় করা যাবে কি?
সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ১০ মহররমের বিশেষ মর্যাদার মূল কারণ হলো—এই দিনে আল্লাহ তাআলা নবী মুসা (আ.) এবং তাঁর অনুসারী বনি ইসরাইলকে ফেরাউনের জুলুম থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মদিনায় এসে দেখলেন, ইহুদিরা আশুরার দিন রোজা রাখছে। কারণ জানতে চাইলে তারা জানায়—
"এটি এমন একটি মহান দিন, যেদিন আল্লাহ মুসা (আ.) ও বনি ইসরাইলকে ফেরাউনের হাত থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। তাই মুসা (আ.) এদিন রোজা রাখতেন।"
তখন রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন—
"মুসা (আ.)-এর অনুসরণ করার ব্যাপারে তোমাদের চেয়ে আমাদের অধিকার বেশি।"
এরপর তিনি নিজেও রোজা রাখেন এবং সাহাবিদেরও রোজা রাখার নির্দেশ দেন।
(সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৩০; সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০০৪)
অতএব, ১০ মহররমের ফজিলতের মূল ভিত্তি হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে নবী মুসা (আ.) ও তাঁর জাতির মুক্তি লাভের স্মরণ।
সমাজে প্রচলিত রয়েছে যে, আশুরার দিন—
তবে এসব ঘটনার পক্ষে সহিহ ও নির্ভরযোগ্য হাদিসে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। ইসলামী গবেষক ও মুহাদ্দিসদের মতে, এসব বর্ণনার অধিকাংশই দুর্বল বা ভিত্তিহীন। তাই এ ধরনের তথ্য প্রচারের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা উচিত।
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর ইন্তেকালের প্রায় ৫০ বছর পর ৬১ হিজরির ১০ মহররমে কারবালার প্রান্তরে তাঁর প্রিয় দৌহিত্র হজরত হুসাইন (রা.) শাহাদাত বরণ করেন। ইসলামের ইতিহাসে এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও হৃদয়বিদারক একটি ঘটনা।
মুসলমানরা এদিন হজরত হুসাইন (রা.)-এর ত্যাগ, সত্যের প্রতি অবিচলতা এবং জুলুমের বিরুদ্ধে অবস্থানকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কারবালার ঘটনা ১০ মহররমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার কারণ নয়। কারণ আশুরার রোজা ও এ দিনের ফজিলত রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর যুগ থেকেই নির্ধারিত ছিল, যা কারবালার ঘটনার বহু বছর আগে থেকেই প্রচলিত।
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইহুদিদের থেকে ভিন্নতা বজায় রাখতে পরবর্তী বছর ৯ ও ১০ মহররম একসঙ্গে রোজা রাখার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন।
তিনি বলেন—
"আমি যদি আগামী বছর জীবিত থাকি, তবে অবশ্যই নবম তারিখেও রোজা রাখব।"
(সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৩৪)
এ কারণে আলেমগণ ৯ ও ১০ মহররম অথবা ১০ ও ১১ মহররম—দুটি দিন রোজা রাখাকে উত্তম বলেছেন।
১০ মহররম বা আশুরার দিন ইসলামে মর্যাদাপূর্ণ হওয়ার প্রধান কারণ হলো—এ দিনে আল্লাহ তাআলা নবী মুসা (আ.) ও বনি ইসরাইলকে ফেরাউনের অত্যাচার থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজে এদিন রোজা রেখেছেন, সাহাবিদেরও উৎসাহিত করেছেন এবং এ রোজার বিনিময়ে এক বছরের সগিরা গুনাহ ক্ষমার সুসংবাদ দিয়েছেন।
অন্যদিকে, কারবালার শোকাবহ ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটিই আশুরার মর্যাদার মূল কারণ নয়। তাই সহিহ কুরআন ও হাদিসের আলোকে আশুরার প্রকৃত তাৎপর্য জানা এবং সে অনুযায়ী আমল করাই একজন মুসলমানের কর্তব্য।