প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছেন মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। দায়িত্ব গ্রহণের ছয় মাস পূর্তি উপলক্ষে তিনি সাংবাদিকদের সামনে এসে তুলে ধরেছেন জেলা প্রশাসনের সাফল্য, চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। একই সঙ্গে গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে জানতে চেয়েছেন—চট্টগ্রামের মানুষ প্রশাসনের কাছে কী প্রত্যাশা করে এবং কোথায় আরও উন্নতির সুযোগ রয়েছে।
স্থানীয় সাংবাদিকদের মতে, কোনো জেলা প্রশাসক এভাবে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আত্মসমালোচনামূলক আলোচনা ও সরাসরি মতামত গ্রহণের উদ্যোগ খুব কমই নিয়েছেন। এর আগে নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক হিসেবেও দায়িত্ব পালনকালে ছয় মাস পূর্তি উপলক্ষে একই ধরনের আয়োজন করেছিলেন তিনি।
বুধবার (২০ মে) সকালে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউস সম্মেলন কক্ষে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে ‘স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ৬ মাস’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ২০২৫ সালের ১৮ নভেম্বর চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর ছয় মাস পূর্তি উপলক্ষে এই আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানের শুরুতে ভিডিওচিত্রের মাধ্যমে গত ছয় মাসে জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন কার্যক্রম উপস্থাপন করা হয়। এতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, মানবিক উদ্যোগ, সাংস্কৃতিক আয়োজন, সরকারের অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচি এবং গণশুনানি কার্যক্রম তুলে ধরা হয়।
ভিডিওচিত্রে উল্লেখ করা হয়, ৫ আগস্ট-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আইনশৃঙ্খলার চ্যালেঞ্জের মধ্যেও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। নির্বাচনকে ঘিরে জেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও কোস্টগার্ডের সমন্বয়ে বিশেষ নিরাপত্তা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি নিশ্চিত এবং সিসি ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলেও জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে আলোচনায় উঠে আসে জঙ্গল সলিমপুরে পরিচালিত অভিযান। দীর্ঘদিন ধরে অপরাধচক্র ও দখলদারিত্বের কারণে আলোচিত এই এলাকাকে ‘রাষ্ট্রের ভেতরে আরেক রাষ্ট্র’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। জেলা প্রশাসক জানান, সেনাবাহিনী, র্যাব, বিজিবি, পুলিশ ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের সমন্বয়ে পরিচালিত অভিযানে কোনো প্রাণহানি ছাড়াই এলাকা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে। পরবর্তীতে সেখানে পরিকল্পিত ভূমি ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু করা হয়।
এ ছাড়া ডিসি পার্কে ফুল উৎসব, ডিসি হিলে বাংলা নববর্ষ উদযাপন এবং ঈদুল আজহা উপলক্ষে ‘ফেস্টিভ সেল’ চালুর উদ্যোগও তুলে ধরা হয়। জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় অবৈধ মজুদ ও চোরাচালানবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে সীতাকুণ্ডে ২৫ হাজার লিটার অবৈধ ডিজেল জব্দের তথ্যও উপস্থাপন করা হয়।
গত ছয় মাসে ভূমি উদ্ধার, শ্রমিক অধিকার, ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রম, খাল পুনঃখনন, বৃক্ষরোপণ, সংস্কৃতি চর্চা, কারাগারে মানবিক উদ্যোগ এবং প্রবাসীদের জন্য অনলাইন গণশুনানিসহ বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণের কথাও জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনের মূল আকর্ষণ হয়ে ওঠে জেলা প্রশাসকের আত্মসমালোচনামূলক বক্তব্য। মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, “মানুষের প্রত্যাশা পূরণে আমরা কতটুকু সফল হচ্ছি, কোথায় ঘাটতি রয়েছে এবং আরও কীভাবে কার্যকর হওয়া যায়—সেটি জানতে গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে এসেছি।”
তিনি আরও বলেন, “সমাজের বাস্তব চিত্র সবচেয়ে বেশি তুলে ধরেন সাংবাদিকরা। তাদের পরামর্শ ও সমালোচনা প্রশাসনকে আরও দায়িত্বশীলভাবে কাজ করতে সহায়তা করবে।”
নিজের সীমাবদ্ধতার বিষয়েও খোলামেলা বক্তব্য দেন জেলা প্রশাসক। তিনি বলেন, “প্রত্যেক মানুষেরই সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবে দায়িত্বের জায়গা থেকে শতভাগ আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করছি।”
গণমাধ্যমের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, “গত ছয় মাসে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সহকর্মীরা যেভাবে সহযোগিতা করেছেন, তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। ভবিষ্যতেও আপনাদের সহযোগিতা, সমালোচনা ও পরামর্শ আমাদের কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করবে।”
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন গোলাম মাঈনউদ্দিন হাসান, মো. শরীফ উদ্দিন, মো. কামরুজ্জামান, সৈয়দ মাহবুবুল হকসহ জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এছাড়া চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব-এর ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি জাহিদুল করিম কচিসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা অংশ নেন।