
ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, চলতি বছরের মধ্যেই তিনি বাংলাদেশে ফিরবেন। ভারতের সংবাদমাধ্যম NDTV-কে দেওয়া এক বিশেষ ইমেল সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, রাজনৈতিক বাধা ও আইনি রায় তাকে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত থেকে বিরত রাখতে পারবে না।
বর্তমানে মৃত্যুদণ্ডের রায় এবং আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকলেও তিনি বলেন, তার দেশে ফেরা ব্যক্তিগত ইচ্ছার বিষয় নয়; বরং গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং জনগণের রাজনৈতিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার সঙ্গে এটি সম্পর্কিত।
সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, তার বিরুদ্ধে দেওয়া রায়কে তিনি বৈধ বিচার হিসেবে দেখেন না। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এটি একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও অসাংবিধানিক প্রক্রিয়া, যার লক্ষ্য আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করা।
তিনি বলেন, অতীতে পরিবারের সদস্যদের হত্যাকাণ্ড, একাধিক প্রাণনাশের চেষ্টা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলা করেও তিনি জনগণের পাশে ছিলেন। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতেও তিনি দেশে ফেরার সিদ্ধান্তে অটল রয়েছেন।
আরও পড়ুন:
৩২ ঘণ্টা পর ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিত উদ্ধার ১৮ দিনের নবজাতক
আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সক্ষমতা প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, দলটি শুধু একটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক সংগঠন নয়; বরং দেশের মানুষের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক গড়ে ওঠা একটি শক্তি।

তার দাবি, আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা অন্য কোনো দলের ব্যর্থতার ওপর নির্ভরশীল নয়। বরং জনগণ বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে অতীতের তুলনা করে আওয়ামী লীগের সময়কার উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার বিষয়গুলো মূল্যায়ন করছে।
দলের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের পুনরুত্থান সরকারের সদিচ্ছার ওপর নয়, বরং জনগণের সমর্থনের ওপর নির্ভর করে।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, দলের কার্যালয় বন্ধ, হাজারো মামলা এবং রাজনৈতিক চাপ থাকা সত্ত্বেও দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের সমর্থনে কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে। তিনি আরও বলেন, গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হলে দলের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং রাজনৈতিক মামলাগুলো প্রত্যাহার করা প্রয়োজন।
দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ৫ আগস্টের পর থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ এবং অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রব্যবস্থার ওপর আঘাত এসেছে।
তিনি অভিযোগ করেন, মুক্তিযোদ্ধাদের অসম্মান, জাতীয় স্মৃতিচিহ্নে হামলা, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের ওপর আক্রমণ এবং উগ্রবাদের বিস্তার দেশের জন্য উদ্বেগজনক।
সাক্ষাৎকারে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডও তুলে ধরেন শেখ হাসিনা।
তার দাবি অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৭.২৫ শতাংশ, মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছিল ২ হাজার ৭৯৩ মার্কিন ডলার। একই সময়ে দারিদ্র্যের হার কমে ১৮.৭ শতাংশে নেমে আসে এবং শতভাগ বিদ্যুৎ সুবিধা নিশ্চিত করা হয়।
এ ছাড়া পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেলসহ বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্প, ভূমিহীনদের পুনর্বাসন এবং বিনামূল্যে ঘর নির্মাণের বিষয়ও তিনি উল্লেখ করেন।
হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, আদিবাসী, আহমদিয়া ও সুফি সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন শেখ হাসিনা।
তিনি বলেন, সংখ্যালঘুরা দেশের সমান মর্যাদাসম্পন্ন নাগরিক এবং তাদের ওপর যেকোনো হামলা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার পরিপন্থী। এসব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করারও আহ্বান জানান তিনি।
ভারতে বর্তমান জীবন নিয়ে প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ব্যক্তিগত জীবনের চেয়ে বাংলাদেশের মানুষের অধিকার ও গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়টি তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি জানান, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ থাকলেও তার মন সবসময় বাংলাদেশে পড়ে থাকে। বিদেশে অবস্থান করেও তিনি দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতি তুলে ধরছেন।
সাক্ষাৎকারের শেষদিকে তিনি বলেন, জনগণের শক্তির মাধ্যমে একদিন দেশে গণতন্ত্র ফিরে আসবে এবং আওয়ামী লীগ আবারও রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।