
উন্নত জীবনের স্বপ্ন নিয়ে প্রতিবছর হাজার হাজার বাংলাদেশি বিদেশে পাড়ি জমান। কিন্তু বিদেশে গিয়ে অনেকেই প্রত্যাশিত সাফল্য তো দূরের কথা, অভিবাসনের বিপুল ব্যয়ই তুলতে হিমশিম খাচ্ছেন। ঋণ, দালালচক্র ও বাড়তি ভিসা ব্যয়ের চাপে প্রবাসজীবন অনেকের জন্য হয়ে উঠছে টিকে থাকার সংগ্রাম।
নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলার বাসিন্দা ইয়াসিন হামিদ ২০২৫ সালের মার্চে কাজের উদ্দেশ্যে কাতারে যান। আত্মীয়ের মাধ্যমে ‘ফ্রি ভিসা’ কিনতে এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে তার মোট ব্যয় হয় প্রায় পাঁচ লাখ টাকা। এই অর্থের একটি বড় অংশ জোগাড় করতে তাকে ঋণ নিতে ও জমি বিক্রি করতে হয়েছে।
কাতার থেকে ইয়াসিন জানান, মাসে এক হাজার কাতারি রিয়াল আয় করলেও থাকা-খাওয়ার খরচ এবং ইকামা নবায়নের ব্যয় মেটাতে গিয়ে দেশে খুব সামান্য অর্থ পাঠাতে পারেন। বিদেশে যাওয়ার এক বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো পুরো খরচের বেশিরভাগই তুলতে পারেননি।
শুধু ইয়াসিন নন, একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হাজারো বাংলাদেশি শ্রমিক। অনেকে ঋণ নিয়ে বিদেশে গিয়ে কাজ না পেয়ে কিংবা আয় কম হওয়ায় অভিবাসন ব্যয়ই ফেরত তুলতে পারছেন না। কেউ কেউ বৈধ কাগজপত্রের খরচ বহন করতে না পেরে অবৈধ অবস্থায় কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ‘কস্ট অব মাইগ্রেশন’ গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে একজন শ্রমিকের গড় অভিবাসন ব্যয় ২০২২ সালে ছিল ৩ লাখ ৮৬ হাজার টাকা। ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪ লাখ ১৭ হাজার টাকা এবং ২০২৪ সালে পৌঁছায় ৪ লাখ ৬৩ হাজার টাকায়। দুই বছরে অভিবাসন ব্যয় বেড়েছে প্রায় ২১ শতাংশ।
গবেষণায় দেখা গেছে, একজন বাংলাদেশি শ্রমিককে বিদেশে যাওয়ার খরচ তুলতে গড়ে ১০ মাসেরও বেশি সময় কাজ করতে হয়। অথচ ফিলিপাইনের শ্রমিকদের ক্ষেত্রে একই ব্যয় তুলতে সময় লাগে মাত্র এক থেকে দেড় মাস।
আইএলওর বিশ্লেষণ বলছে, মোট অভিবাসন ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশ যাচ্ছে ভিসা ও মধ্যস্বত্বভোগীদের পেছনে। ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, মোট ব্যয়ের ৩৮ শতাংশ ভিসা-সংক্রান্ত খাতে এবং ৩৫ শতাংশ দালাল বা রিক্রুটারদের কাছে ব্যয় হয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৭৩ শতাংশ অর্থ ব্যয় হচ্ছে এই দুই খাতে।
সৌদি আরবপ্রবাসী ফরহাদ জানান, ছয় লাখ টাকা খরচ করে বিদেশে গেলেও শুরুতে কাজ না পাওয়ায় দীর্ঘ সময় দেশে টাকা পাঠাতে পারেননি। বর্তমানে ইকামা নবায়নের খরচ, ঋণ পরিশোধ এবং পারিবারিক দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে চরম সংকটে রয়েছেন তিনি। বৈধতা ধরে রাখতে না পেরে এখন অবৈধভাবে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, তরুণ শ্রমিক, নিম্ন আয়ের মানুষ এবং নারী অভিবাসীরা তুলনামূলক বেশি আর্থিক ঝুঁকির মুখে থাকেন। তাদের অনেকের ক্ষেত্রে বিদেশে যাওয়ার ব্যয় তুলতে এক বছরেরও বেশি সময় লেগে যায়।
অভিবাসন ব্যয়ের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান উদ্বেগজনক বলেও উল্লেখ করেছে আইএলও। ফিলিপাইন, ঘানা, লাওস বা মালদ্বীপের তুলনায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের বিদেশে যেতে অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয় এবং সেই ব্যয় পুনরুদ্ধার করতেও বেশি সময় লাগে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভিসা বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ, দালালনির্ভর নিয়োগব্যবস্থা কমানো এবং রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর ওপর কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা গেলে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের ম্যানেজার সালেহ রাব্বীর মতে, শ্রম অভিবাসন খাতে মধ্যস্বত্বভোগীদের আধিপত্য কমিয়ে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক নিয়োগব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে ভিসা বাণিজ্য বন্ধ এবং কার্যকর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে অভিবাসন ব্যয় অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশে কর্মসংস্থান বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হলেও উচ্চ অভিবাসন ব্যয় কমানো না গেলে প্রবাসীদের স্বপ্ন ক্রমেই ঋণ ও অনিশ্চয়তার বোঝায় চাপা পড়ে যাবে।